logo
logo
news image

জীবনের প্রয়োজনে জীবন বীমা

কায়রোর বিমান দুর্ঘটনা ও ফরিদপুরের হেলিকপ্টার দুর্ঘটনার কথা অনেকেরই হয়তো মনে আছে।  এরই এক দুর্ঘটনায় আমাদের এক বিশিষ্ট বন্ধুর মৃত্যু ঘটে। অত্যন্ত খ্যাতনামা ব্যক্তি ছিলেন তিনি। বাঙালি ব্যবসায়ীদের মধ্যে একজন নেত্বৃত্বস্থানীয় ব্যক্তি তিনি। তার সম্পদও ছিল যথেষ্ট। অথচ তার আকস্মিক মৃত্যুর পর দেখা গেল তার স্ত্রী ভীষণ সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন।  ব্যাংকে টাকা আছে, ব্যবসাতেও টাকা নিয়োগ করা হয়েছে; বাজারে অনেক পাওনা আদায়ও বাকী আছে। কিন্তু নগদ টাকা হাতে নেই। ব্যাংকে অপারেশন করা যাচ্ছে না। নানা রকমের আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন। অন্যান্য টাকা আদায় করতে হলেও সময়ের দরকার। ছুটোছুটি করার জন্যেও টাকার বিশেষ দরকার। তদুপরি যতদিন পর্যন্ত না টাকার যোগাড় হয়, ততদিন পর্যন্ত সংসার চালাতে হবে। আমার মনে পড়ছে তখন কিভাবে সামান্য ২৫ হাজার  টাকার একটি বীমা পলিসি ঐ পরিবারের উপকারে এসেছিল। মাত্র ক’দিনের মধ্যে বীমা কোম্পানি সেই পলিসির টাকা নগদ পরিশোধ করে দিয়েছিল। আর ঐ নগদ টাকার সাহায্যেই পরে মৃত্যের সমুদয় সম্পত্তি এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়োজিত অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল।
অল্প সঞ্চয়ের মাধ্যমে কিস্তিবন্দীতে নিজের বা পরিবারের জন্য ‘এস্টেট’ তৈরি করার একমাত্র আধুনিক ব্যবস্থা হচ্ছে জীবন বীমা। এক সঙ্গে লক্ষ টাকা ব্যয় করে অনেকের পক্ষে একটা সম্পত্তি বা ‘এস্টেট’ ক্রয় করা জীবদ্দশায় কোনক্রমেই হয়তো সম্ভব নয়, কিন্তু যে কেউ প্রত্যেক তিন মাস অন্তর অন্তর বার-তেরশ’ টাকা জমা করে ২৫-২৬ বছরের মেয়াদান্তে এক লক্ষ টাকার একটি নগদ ‘এস্টেট’ তৈরি করতে পারেন। শুধু তাই নয়, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে যে কোনদিন তার মৃত্যু ঘটলে তার পরিবার আর কোন টাকা জমা না করে সঙ্গে সঙ্গে মৃত ব্যক্তির এই নির্ধারিত সম্পূর্ণ নগদ এস্টেটের অধিকারি (এক লক্ষ টাকা) হতে পারেন।
বীমার মাধমে সম্পত্তি ক্রয় এবং নগদ অর্থ ব্যয় করে সম্পত্তি ক্রয়ের মধ্যে তাই একটা বড় রকমের পার্থক্য রয়েছে এবং এর সুবিধা রয়েছে অনেক। যেখানে বীমা পলিসি করে সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধ না করেও একজন তার ইপ্সিত গোটা এস্টেটের অধিকারী হওয়ার নিশ্চিত গ্যারান্টি লাভ করছেন, সেখানে অন্য যে কোন ব্যবস্থায় তাকে স্বভাবতই এস্টেটের নির্ধারিত মূল্যের সমুদয় টাকা এককালীন আদায় করতে হচ্ছে। জীবন বীমার মাধ্যমে সহজতর উপায়ে এস্টেট ক্রয়  করে সেই এস্টেট থেকে নিয়মিত আয়ের ব্যবস্থা করা যায়। এটা যদিও সত্য, তবু অনেক সময় দেখা গেছে এস্টেটের আয় পেতে হলে এর সুষ্ঠু পরিচালনার প্রয়োজন হয়। কিন্তু এটা করবে কে? উপার্জনশীল অভিভাবকের আকস্মিক মৃত্যু হলে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়ে কিংবা অনভিজ্ঞ বিধবা স্ত্রী অনেক সময় এ রকম এস্টেট সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে অসমর্থ হন এবং এর ফলে এস্টেট থেকে প্রাপ্ত আয়ের পরিকল্পনা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। অনুরূপভাবে অবসরকালীন জীবনযাপনকালে এবং বৃদ্ধাবস্থায় এ রকম এস্টেট পরিচালনার ঝামেলা বহন করা সম্ভব হয় না। এ সমস্যার সমাধান বীমা প্রতিনিধিরা করে দিতে সক্ষম। পরিবারের বৃত্তি নির্বাহী পরিকল্পনা এবং আজীবন এনুইটি প্রদান পরিকল্পনা গ্রহণ করে এ সমস্যার সাফল্যজনক সমাধান করা যেতে পারে।
আমরা সাধারণত সঞ্চয় করি ব্যাংকে, সঞ্চয় করি বীমার মাধ্যমে। আমাদের উদ্দেশ্য অল্প অল্প সঞ্চয়ের মাধ্যমে মোট সঞ্চিত অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধি করা এবং বিপদের যে কোন মুহুর্তে এটাকে কাজে লাগানো। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে- ব্যাংকের মাধ্যমে সঞ্চয় করা হলেও সে সঞ্চয় বীমার সঞ্চয়ের মতো এক বাধ্যতামূলক অভ্যাসে পরিণত হয় না। ব্যাংকে সঞ্চয় করলে অতি নগণ্য প্রয়োজনেই সঞ্চয়কৃত অর্থ উঠিয়ে নেয়ার প্রবণতা আমাদের মধ্যে অনেকেরই রয়েছে। তাই ব্যাংকের মাধ্যমে সঞ্চয়ের পরিমাণ স্বভাবতই বাড়তে পারে না। কিন্তু একবার ‘প্রিমিয়াম’ হিসেবে জীবন বীমাতে নির্দিষ্ট দেয় আদায় করার পর সে সঞ্চয় ক্রমেই বাড়তে থাকে। কারণ ব্যাংকের মতো ইচ্ছে করলেই বীমার গচ্ছিত টাকা উঠানো যায় না। সেখানে আনুষ্ঠানিকতার কিছুটা প্রয়োজন রয়েছে। এতে বীমার সঞ্চয় ক্রমশই বাড়তে থাকে। এটা বাড়বার আর একটা কারণ, আগেই বলা হয়েছে এর সঞ্চয় বাধ্যতামূলক। নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে নির্দিষ্ট কিস্তিতে নির্ধারিত পরিমাণ প্রিমিয়ামের টাকা দাখিল করতেই হয়, নচেত বীমা পলিসির ক্ষতি হয়। স্বল্প সঞ্চয় সম্পর্কে Goethe একটি সুন্দর কথা বলেছেন- “Riches amassed in haste will diminish but, those collected little and little will multiply”
বীমার মাধ্যমে স্বল্প সঞ্চয়ে একদিন যে মোটা তহবিল গড়ে ওঠে, অনেকের কাছে এটাকে ভুলে যাওয়া তহবিল বলে মনে হয়। অর্থাৎ বীমার মাধ্যমে যে সঞ্চয় হয়, তাতে অনেকেরই গায়ে বাধে না। অথচ একদিন দেখতে পাওয়া যায় একটা মোটা পরিমাণ অঙ্ক জমা হয়ে রয়েছে।বীমাকে ভুলে যাওয়া তহবিল বলে উল্লেখ করলাম যে কারণে তার একটি বাস্তব ঘটনা তুলে ধরছি। যদিও সেটা একান্তই ব্যক্তিগত।
চট্টগ্রামে একটি বাড়ি তৈরি করছিলাম। বাড়ি তৈরি করার শেষ পর্যায়ে এক দারুণ অর্থসঙ্কটের সম্মুখীন হলাম। সংগৃহীত সমস্ত অর্থই প্রায় নিঃশেষিত। এমন এক অবস্থার মুখোমুখি হলাম-বাড়ির কাজ শেষ হয়ে গেছে কিন্তু ‘বাউন্ডারি ওয়াল’ অর্থাৎ ‘সীমানা প্রাচীর’ দেয়ার পয়সা নেই। কোথায় পাই টাকা? ব্যাংকে টাকা ধার পাওয়া যাবে না। অনেক টাকা ওভার ড্রাফট হয়ে গেছে। কার কাছে টাকার জন্য হাত পাতবো? অথচ সামান্য হাজার চারেক টাকা হলেই আমার কাজটুকু সমাধা হয়। অল্প দিনের মেয়াদে এ টাকাটা জোগাড় করতে পারলেও কাজ হয়ে যায়।
কারণ সম্পূর্ণ বাড়ি তৈরি হয়ে গেলে বাড়িটা ভাড়া দেয়া যেতে পারে, এবং অগ্রিম ভাড়াও পাওয়া যেতে পারে। একদিন ভোরবেলা বাইরের লনে বসে বসে চিন্তা করছি কী করে টাকার ব্যবস্থা করা যায়। হঠাৎ মনে হলো এত ভাবছি কেন, আমার নিজের জীবন বীমার পলিসি থেকে ধার নেই না কেন? স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লাম। মনে মনে হাসলাম। এই সেদিনও আমার এক পলিসি গ্রহণকারী বন্ধুকে আমি উপদেশ দিয়েছিলাম তার পলিসি থেকে টাকা ধার নিতে। সেও আমার মতো হঠাৎ একটা আর্থিক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিল। অথচ কী আশ্চর্য! আমার নিজের বেলায় একটিবারও তা মনে আসেনি। তাই জীবন বীমার তহবিলকে আমি বলেছি “ভুলে যাওয়া” তহবিল। অথচ সময়ে এর মূল্য অনেক।
আকস্মিক দুর্ঘটনা কিংবা কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে অনেকের উপার্জন ক্ষমতা লোপ পায়। অনেক সময় হঠাৎ অনেকের বেকারত্ব ঘটে। এ রকম দুঃসময়ে জীবন বীমা পলিসি মানুষের এক বিশেষ উপকার সাধণ করে। পলিসি থেকে সহজ উপায়ে ঋণ গ্রহণ করা যেতে পারে কিংবা প্রয়োজনবোধে পলিসির সমর্পণ-মূল্য এই বিপদে নিরাপত্তার আশার আলো বিকীরণ করে।
জীবন বীমার মূলসূত্র হলো সঞ্চয়, আর এই সঞ্চয় নির্ভর করছে অর্থনীতির ভাষায় সঞ্চয় করার ক্ষমতার ওপর এবং সর্বোপরি সঞ্চয় করার ইচ্ছের ওপর। সঞ্চয় করার ক্ষমতা থাকলেও ইচ্ছে না থাকলে সঞ্চয় সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। জীবন বীমার কর্মীরা তাদের সুনিপুণ বিক্রয় কৈশলের মাধ্যমে মানুষের সেই ইচ্ছাকেই জাগ্রত করে তোলেন এবং তা বাস্তবায়িত হয়ে ওঠে জীবন বীমার পলিসি গ্রহণের মাধ্যমে। মানুষ প্রয়োজনের দাস। অভাব ও চাহিদা মেটানোর জন্যই মানুষের এই কর্মতৎপরতা। জীবন বীমার প্রয়োজন আছে- এটা সম্ভাব্য বীমা ক্রেতাকে যখন বোঝানো যাবে তখনই তিনি জীবন বীমার পলিসি গ্রহণ করবেন। আর এটা সম্পূর্ণ নির্ভর করে জীবন বীমা প্রতিনিধির নিজস্ব ব্যক্তিত্ব, জ্ঞান ও বিক্রয়শৈলীর নিপুণ প্রয়োগের ওপর।
এরকম অনেক ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে; যেখানে চাকরি চলে গেছে এমন লোককেও জীবন বীমার প্রতিনিধি বীমার পলিসি বিক্রয় করেছেন। এমন অনেক সময় আসে যখন মানুষ সাময়িকভাবে হলেও ঋণগ্রস্ত হয়, ব্যবসা-বাণিজ্যে ক্ষতির সম্মুখীন হয়। সাধারণত মনে হবে এ রকম অবস্থায় জীবন বীমা পলিসি বিক্রয় করা সম্ভব নয়। কিন্তু জীবন বীমার প্রতিনিধির অকাট্য যুক্তি এমন অনেক লোককেও জীবন বীমার পলিসি ক্রয় করতে অনুপ্রাণিত করেছে। জীবন বীমা প্রতিনিধি এমনভাবে যুক্তির অবতরণ করে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, এ রকম অবস্থাতেই মানুষের বীমা পলিসির সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
দুটো বাস্তব ঘটনার উদাহরণ দেই-
এক ব্যক্তি চাকরি হারিয়েছেন। ঠিক এমনই সম এক খ্যাতনামা জীবন বীমার প্রতিনিধি তাকে বললেন জীবন বীমার পলিসি নিতে। বুঝিয়ে বললেন যে এই সময়েই তার জীবন বীমার প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি। কারণ এ অবস্থায় যদি তার মৃত্যু হয় তাহলে তার পরিবার সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে। এদের বাঁচানোর জন্য অবিলম্বে তার জীবন বীমার পলিসি নেয়া দরকার। সম্ভাব্য ক্রেতা বললেন, এর প্রয়োজনীয়তা হয়তোবা রয়েছে, কিন্তু তার যে টাকা নেই। জীবন বীমার প্রতিনিধি বললেন- “কী এমন টাকা লাগবে। আপনি মাসিক কিস্তিতে পলিসি গ্রহণ করুন, পরে চাকরি হয়ে গেলে কিস্তি পরিশোধের পদ্ধতি সুবিধামতো পরিবর্তন করে নেবেন।” আরো বললেন, ঋণ  করেই হোক, আর যেভাবেই হোক, আপনার পরিবারকে তো আপনার চালাতেই হবে। এর মধ্যে থেকে মাসে মাসে না হয় কিছু টাকা জীবন বীমার জন্য অতিরিক্ত ধার করলেন। কারণ আপনাদের দুবেলা খাওয়ার চাইতে এ মুহুর্তে জীবন বীমার পলিসি নেয়া কম প্রয়োজনীয় নয়। এতো দৃঢ়তার সঙ্গে জীবন বীমার প্রতিনিধি তার বক্তব্য পেশ করলেন। তার সম্ভাব্য ক্রেতার স্থির বিশ্বাস হয়ে গেল যে তার জীবন বীমার পলিসি গ্রহণ করা দরকার। মাসিক কিস্তিতে তখনই তিনি একটি বীমা পলিসি গ্রহণ করলেন। ঘটনাপ্রবাহ এ রকম মোড় নিল যে মাত্র পনের দিনের ব্যবধানে তার আকস্মিক মৃত্যু তাকে তার পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে চিরদিনের জন্য বিদায় নিতে বাধ্য করলো। মনে হলো- জীবন বীমার প্রতিনিধি যেন তার সম্ভাব্য ক্রেতার আসন্ন মৃত্যুকে তার দিব্য দৃষ্টি দিয়ে দেখতে পেরেছিলেন। এর চেয়ে কঠিন আর রূঢ় বাস্তব আর কী হতে পারে।
অন্য ঘটনাটি ঘটেছে একজন চাকরিজীবীর জীবনে।
একজন জীবন বীমার প্রতিনিধি তার কাছে বীমার প্রস্তাব করলে তিনি বললেন, জীবন বীমায় তিনি বিশ্বাসী এবং জীবন বীমা তিনি করবেন; তবে ঠিক এখনই নয়, পরে। কারণ তখন তিনি ঋণগ্রস্ত। ‘গৃহনির্মাণ ঋণদান সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে তিনি তখন একটা বাড়ি তৈরি করছেন। তা ছাড়া অন্যত্রও তিনি ঋণী। বাড়ি তৈরির কাজ তখনও শেষ হয়নি। আরো মাস তিনেক লাগবে। বাড়ি তৈরির কাজ শেষ হয়ে গেলে বাড়ি ভাড়া দিয়ে যে অগ্রিম অর্থ হাতে পাবেন, তা দিয়ে সব ঋণ শোধ করে জীবন বীমার পলিসি গ্রহণ করবেন। কারণ তার পক্ষে তখন সংসার চালানোই শক্ত। জীবন বীমার প্রতিনিধি তার সব কথা শুনে বললেন- “তবু তো সংসার আপনার চালাতেই হচ্ছে, সংসারের চাকা তো ঘুরাতেই হচ্ছে আপনাকে। সংসারের প্রয়োজনীয় টাকা যখন আপনাকে জোগাড় করতেই হয়, তখন অন্তত বছরখানেকের জন্য হলেও একটা জীবন বীমার পলিসি গ্রহণ করুন। কারণ খোদা না করুক বাড়ি তৈরির কাজ শেষ হওয়ার আগেই যদি আপনার মৃত্যু ঘটে, তাহলে যে আশা নিয়ে আপনার ও আপনার পরিবারের ভবিষ্যৎ সুখ ও নিরাপত্তার জন্য এমন সুন্দর একটা বাড়ি করতে যাচ্ছেন, সেটা হয়তো আপনার পরিবারের হাত ছাড়া হয়ে যেতে পারে। বাড়ি বন্ধক দিয়ে যে ঋণ আপনি গ্রহণ করেছেন তার জন্য আপনার বাড়ি অপরের মালিকানায় চলে যাবে। আপনিই বলুন আপনার কি এটাই কাম্য?” জোরালো এবং স্পষ্ট ভাষায় জীবন বীমা প্রতিনিধি তার বক্তব্য তুলে ধরলেন যে, তার সম্ভাব্য ক্রেতা তৎক্ষণাৎ জীবন বীমার প্রস্তাবপত্রে স্বাক্ষর দান করলেন।
এ ক্ষেত্রেও যা ঘটবার তাই ঘটল। বাড়ির নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার আগেই তার মৃত্যু ঘটলো। জীবন বীমা প্রতিনিধির প্রত্যেকটি কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হলো। বীমা প্রদত্ত অর্থই শেষ পর্যন্ত মৃতের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করলো। সমস্ত ঋণ পরিশোধ করে তার পরিবার উক্ত বাড়ির অধিকারী হলো। শুধু তাই নয়, একটি অসহায় পরিবার ঐ বাড়ির আয় থেকে নিজেদের ভবিষ্যৎ জীবনের সংস্থান খুঁজে পেল। প্রত্যেক পিতা-মাতাই একান্তভাবে কামনা করেন- তাদের ছেলে-মেয়েরা উপযুক্ত শিক্ষালাভ করে জীবনের সুপ্রতিষ্ঠিত হোক। এর জন্য পিতা-মাতার চিন্তাভাবনার অন্ত থাকে না। এটা যে শুধু পিতা-মাতার কর্তব্যেরই প্রতিফলন তা নয়, মানুষের স্নেহ, প্রীতি ও ভালোবাসার স্বভাবজাত বহিঃপ্রকাশ। তাই জীবন বীমার প্রতিনিধিরা যখন পিতা-মাতার এই দুর্বললতার সুযোগ নিয়ে তাদের কাছে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, তাদের শিক্ষাদীক্ষা কিংবা বিবাহের উপযুক্ত একটি সুন্দর বীমা পরিকল্পনার প্রস্তাব দেন, তখন স্বভাবতই এ রকম প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা যায় না। একটা ঘটনার উল্লেখ করছি:
চট্টগ্রামের এক বিত্তশালী ব্যবসায়ীর কাছে আমার এক জীবন বীমা প্রতিনিধি বন্ধু বীমা গ্রহণের প্রস্তাব করলে ভদ্রলোক তার ওপর কিছুটা বিরক্ত হয়ে তাকে অনুরোধ করেন তিনি যেন ভবিষ্যতে তার সঙ্গে বীমা সম্পর্কে আর কোন আলাপ না করেন। কারণ, এটা তিনি বিশ্বাস করেন না। অবশ্য তার সঙ্গে যে বন্ধুত্ব ছিল তা ঠিকই থাকবে এবং অন্য যেকোন বিষয়ে তিনি আলাপ করতে পারেন।
জীবন বীমার প্রতিনিধি তার সঙ্গে আর জীবন বীমার কথা কোন দিন আলাপ করলেন না। কিন্তু তার বাড়িতে যাতায়াত, তার সঙ্গে বন্ধুত্ব অক্ষুণ্ণ রাখলেন এবং আরো বেশি ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করতে লাগলেন। মাস গেল, বছর গেল….। ভদ্রলোক ছিলেন অবিবাহিত। এক সময়ে তার বিয়ের দিন ধার্য করা হলো। জীবন বীমার প্রতিনিধি বন্ধুটি তার বিয়েতে নিমন্ত্রণ পেলেন এবং যথারীতি নিমন্ত্রণে গেলেন। সুন্দর এক উপহারও দিলেন। আরও চার বছরের মতো কেটে গেল।
ভদ্রলোকের ঘর আলো করে জন্ম নিল এক ফুটফুটে সুন্দর পুত্রসন্তান। পুত্রের প্রথম জন্মদিনেও তিনি নিমন্ত্রিতদের মধ্যে ছিলেন এবং জন্মদিনের একটি সুন্দর উপহারও নিয়ে গিয়েছিলেন। দ্বিতীয় জন্মদিনের নিমন্ত্রণের দিন তিনি একটু আগেই তার বাড়িতে গিয়ে হাজির হলেন। নিমন্ত্রণের মধ্যে তখনও অনেকেই আসেননি। এবারে তিনি একটি সুন্দর খেলনা মোটরগাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন ছেলের জন্মদিনের উপহার হিসেবে। ছেলেটি তখন হাঁটতে শিখেছে। গিয়ে দেখলেন পিতার সঙ্গে সে পা পা করে হাঁটছে। তিনি সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন এবং ছেলেন হাতের খেলনাটি উপহার দিলেন। হঠাৎ শিশুর পিতা তাকে লক্ষ করে বললেন, “আচ্ছা!” আপনাদের বীমা কোম্পানিতে এ রকম কি কোন পরিকল্পনা নেই যাতে করে ছেলেদের উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থা করা যায়?” আর যায় কোথায়! তার গাড়িতে রাখা ব্যাগের মধ্যে বীমার প্রস্তাবপত্র তিনি সঙ্গেই রেখেছিলেন। অতিথিরা আসার আগেই একটি বিরাট অঙ্কের প্রস্তাবপত্রে তিনি তার বহুদিনের আকাঙ্ক্ষিত ক্রেতার স্বাক্ষর সংগ্রহ করত সমর্থ হলেন।
জীবন বীমার ব্যবসায়িক আর একট সুফল রয়েছে। জীবন বীমার প্রিমিয়ামের ওপর সরকারের আইনানুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ আয়কর ও মৃত্যুকর মওকুফ করে দেয়া হয়। এর জন্য বিশেষ করে ব্যবসায়ী ও বিত্তশালী ব্যক্তিদের জন্য জীবন বীমা খুবই আকর্ষণীয় ও লাভজনক।
জীবন বীমা কি এবং কেন- এ সম্পর্কে এ পর্যন্ত যা বলা হয়েছে তাতে একজন ব্যক্তিবিশেষ এবং তার পরিবারের বিশেষ প্রয়োজনীয়তার ওপরই জোর দেয়া হয়েছে। দেশ ও রাষ্ট্রীয়ভাবে জীবন বীমার মূল্যায়নও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
বাংলাদেশে জীবন বীমা শিল্পে বহুল প্রচার ও প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তি বিশেষের সঞ্চারের মাধ্যমে যে বৃহদাকার মূলধনের সৃষ্টি হবে- তা দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি স্থায়ী করবে এবং দেশের শিল্প বাণিজ্যের প্রসারে দেশে বড় শিল্প ও কারখানা গড়ে তোলার জন্য যে পর্যাপ্ত পরিমাণ পুঁজির দরকার আশা করা যাচ্ছে- বাংলাদেশের জীবন বীমা শিল্প তার প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম হবে। দেশ ও দেশবাসীর অর্থনৈতিক বুনিয়াদ সুদৃঢ় করে গড়ে তোলার এবং দেশের উচ্চশিক্ষিত যুবকদের বেকার সমস্যা সমাধানের এক বিলষ্ঠ ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে বাংলার বীমা শিল্পকে। বীমার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে এম ব্রিয়ানের ইংরেজি উদ্ধৃতি- “Insurance is a greatest blessing that modern times have restored upon mankind” দিয়ে এই পরিচ্ছেদ শেষ করছি।

কমেন্ট করুন

...

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top