logo
logo
news image

গাড়ির কাগজপত্র তৈরির হিড়িক বিআরটিএতে

গাড়ি চালানোর অনুমতি (ড্রাইভিং লাইসেন্স) পেতে এবং যানবাহনের কাগজপত্র নবায়ন করতে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির কার্যালয়ে আবেদন হঠাৎ বেড়ে গেছে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা চালকের লাইসেন্স ও গাড়ির কাগজপত্র পরীক্ষা শুরু করার পর এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
রাজধানীর মিরপুর ও কেরানীগঞ্জের ইকুরিয়ার বিআরটিএ কার্যালয়ের কর্মকর্তারা এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে তাঁদের সেবার মান আগের মতোই আছে। বিআরটিএর দুই কার্যালয়েই দালালদের দৌরাত্ম্যও চলছে আগের মতোই।

গতকাল রোববার বেলা সাড়ে ১১ টা। মিরপুর বিআরটিএ কার্যালয়। মূল ফটকের বাইরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে তিন-চারজনের ছোট ছোট জটলা। কার্যালয়ের ভেতরে বিভিন্ন কক্ষের আশপাশে, ব্যাংকে, বাদামতলায় সর্বত্র দালালেরা তৎপর। মূল ফটকের পাশে স্ট্যাম্প, ফটোকপির দোকানগুলো তাদের মূল আস্তানা।

বেলা আড়াইটা পর্যন্ত সেখানে থেকে দেখা গেল, দালালদের হাতে দিলে দ্রুত কাজ হয়ে যাচ্ছে। এমনকি ব্যাংকে ফি জমা দেওয়ার ক্ষেত্রেও দালালদের অগ্রাধিকার। সাধারণ সেবাগ্রহীতা ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছেন। সেবা নিতে আসা লোকজন অভিযোগ করেন, সাধারণ প্রক্রিয়ায় সেবা পেতে অযথা হয়রানি করা হচ্ছে। অথচ দালালদের দিয়ে দ্রুত কাজ হয়ে যাচ্ছে।

পাঁচজন দালাল, দুজন আনসার সদস্য এবং দুজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরুর পর যানবাহনের কাগজপত্র ও চালকের লাইসেন্স নবায়ন করতে বিআরটিএতে ভিড় বেড়ে গেছে। গতকাল সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে বিআরটিএতে ছিল উপচে পড়া ভিড়।

সোহাগ নামে এক দালাল বিভিন্ন লোককে কাজ করে দেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছেন। ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে চাইলে তিনি বলেন, এক মাস সময় লাগবে। খরচ পড়বে ৮ হাজার টাকা।

ড্রাইভিং লাইসেন্স করার সরকারি ফি ৩ হাজার ৫০০ টাকা। পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে ছয়-সাত মাস সময় লাগে। শিক্ষানবিশ ড্রাইভিং লাইসেন্স করার ছয় মাস পর ব্যবহারিক পরীক্ষার তারিখ দেওয়া হয়।

কীভাবে এত দ্রুত করে দেবেন জানতে চাইলে সোহাগ বলেন, ‘আমাদের হাতে কোনো কারিশমা নেই। সব কাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাত দিয়ে হয়। আমরা এজেন্ট হিসেবে কিছু কমিশন পাই।’ এরপর ব্যস্ততার ভাব নিয়ে তিনি বলেন, ‘আজকে এত লোক আসতেছে। সবাইকে সেবা দিয়ে শেষ করতে পারছি না।’

কাগজপত্র ঠিক করাতে আসা যানবাহনের সারি দীর্ঘ হতে হতে বিএসএল রেসিডেনসিয়াল কমপ্লেক্স ছাড়িয়ে গেছে। সেখানেও ছুটে যাচ্ছেন দালালেরা। করছেন দর-কষাকষি। সিরিয়াল ছাড়াই সব করে দেওয়ার প্রস্তাব দেন তাঁরা।

সরকার নির্ধারিত ফি জমা দিতে হয় বিআরটিএর কার্যালয়ের ভেতরে থাকা ব্র্যাক ব্যাংকের শাখায়। সেখানে অনেকে অভিযোগ করেন, তাঁরা কয়েক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও টাকা জমা দিতে পারছেন না। অথচ, দালালেরা যখন খুশি আসছেন, টাকা জমা দিয়ে যাচ্ছেন। সেখানে প্রায় আধা ঘণ্টা থেকে দেখা যায়, খুব ধীরগতিতে কাজ চলছে। লোকজন দালালদের সরাতে একটু পরপর হই করে আওয়াজ তুলছেন।

বাড্ডা এলাকা থেকে দুলাল হাওলাদার এসেছেন লাইসেন্স নবায়ন করতে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সকাল ৯টায় লাইনে দাঁড়িয়েছি। সাড়ে ১২টা বাজলেও টাকা জমা দিতে পারিনি। পরে বাধ্য হয়ে এক দালালকে ২০০ টাকা অতিরিক্ত দিয়ে টাকা জমা দিয়েছি।’

বিশা ফটোশপের সামনে কথা হয় দালাল আইয়ুবের সঙ্গে। একটি মোটরসাইকেলের মালিকানা হস্তান্তরের জন্য তিনি দাবি করেন ৬ হাজার টাকা। এক দিনেই কাজ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন। মোটরসাইকেলের মালিকানা হস্তান্তরের জন্য সরকার নির্ধারিত খরচ ৩ হাজার ৬০০ টাকা। প্রক্রিয়া শেষ করতে দু-তিন দিন সময় নেয় বিআরটিএ।

বিআরটিএ কার্যালয়ের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যরাও টাকা নিয়ে কাজ করে দেন। আনসার সদস্য সিদ্দীক, আশরাফুল, রুহুল আমিন, মহিদুল ও ফারুককে লোকজনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে কাজ করে দিতে দেখা যায়। টাকা নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে অস্বীকার করে আনসার সদস্যরা মারমুখী হয়ে ওঠেন।

জানতে চাইলে বিআরটিএর উপপরিচালক মাসুদ আলম প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরুর পর লোকজনের চাপ প্রচুর বেড়েছে। দালালদের তৎপরতা কমাতে বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে। আজকেও (গতকাল) ছয়জন দালালকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে।

আনসার সদস্যদের বিষয়ে মাসুদ আলম বলেন, আগে আনসার সদস্যদের এক বছর পরপর বদলি করা হতো। এখন প্রতি ছয় মাস, দুই মাস পরও বদলি করা হয়। অভিযোগ পাওয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিআরটিএর সেবার মান আরও উন্নত করতে চেষ্টা করা হচ্ছে বলে দাবি করেন এই কর্মকর্তা।

আমাদের কেরানীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, এই অবস্থা দেখা গেছে কেরানীগঞ্জের ইকুরিয়ায় বিআরটিএর ঢাকা দক্ষিণ সার্কেল কার্যালয়েও। ড্রাইভিং লাইসেন্স করার জন্য স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক বেশি লোক এসেছে। যাত্রাবাড়ী থেকে আসা যাত্রীবাহী বাস ইলিশ পরিবহনের চালক কাওছার হোসেন বলেন, জুলাই মাসে ড্রাইভিং লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। মালিক বলছে, এখন থেকে লাইসেন্স রাখতেই হবে। তা না হলে গাড়ি দেওয়া হবে না।

গত পাঁচ দিনে এই কার্যালয়ে নতুন ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদন জমা পড়েছে ১৭৬ টি। আর ঢাকা জেলা শাখা কার্যালয়ে জমা পড়েছে ৪৫২টি আবেদন।

বিআরটিএর ঢাকা দক্ষিণ সার্কেলের সহকারী পরিচালক (প্রকৌশল) নুরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, গত সপ্তাহ থেকে ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদনকারীর সংখ্যা বেড়ে গেছে। গাড়ির ফিটনেস ও রেজিস্ট্রেশনের জন্য মালিকেরাও ভিড় করছেন।

কমেন্ট করুন

...

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top