logo
logo
add image
news image

শিক্ষা খাতে অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ: ড. শরীফ এনামুল কবির

দশ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের ধারাবাহিকতা আর শিক্ষা খাতে নেয়া নানামুখী কর্মসূচির কারণে এ খাতে মোটা দাগে একটা স্থিতিশীলতা এসেছে। শিক্ষায় ডিজিটাল পদ্ধতির প্রবর্তন, অবকাঠামো উন্নয়ন, নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও এমপিওভুক্তিকরণসহ অগ্রগতির আরো খবর আছে। সেই সঙ্গে আছে চ্যালেঞ্জও। টানা তৃতীয়বার সরকারের মেয়াদে এখন যেমন সুযোগ আছে শিক্ষা খাতের আধুনিকায়ন আর মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার, তেমনি এ খাতে রয়েছে খানিকটা চ্যালেঞ্জও।

বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ও বর্তমান বাস্তবতা: সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে সবকিছু। প্রতিক্ষণ আপডেট হচ্ছে বিভিন্ন প্রযুক্তি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বারবার পরিবর্তন করা হচ্ছে রাষ্ট্র পরিচালনার কৌশলও। মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হচ্ছে। সংবিধানসহ আইনের নানা ধারা-উপধারারও পরিবর্তন করা হচ্ছে প্রয়োজনের আলোকে। ১৯৭৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ প্রবর্তিত হওয়ার পর গত হয়েছে চার দশক। দীর্ঘ এ সময়ে একবারও সংশোধন, পরিবর্তন, পরিবর্ধন করা হয়নি এ অধ্যাদেশ। তাই বলে এটি কখনো সংশোধন করা যাবে না, বিষয়টি এমনও নয়। শিক্ষকদের বেতন-ভাতা, গবেষণার মান বৃদ্ধিতে বরাদ্দ বাড়ানোসহ শিক্ষা ও গবেষণার মান নিশ্চিতকরণে নতুন কিছু ধারা সংযোজন করা যেতেই পারে। নতুন প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও অভিন্ন নীতির আওতায় আসতে পারে।

ক্লাস-পরীক্ষার ক্ষেত্রে ন্যূনতম বিধান, বছরে ন্যূনতম গবেষণা-প্রকাশনা, গবেষণার আবশ্যিক বিধান সংযোজন করা যেতে পারে। সেন্টার অব একসিলেন্স নির্মাণের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় আধুনিক গবেষণাগার নির্মাণ ও গবেষণার সর্বোচ্চ পরিবেশ তৈরিও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের জন্য বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে গবেষণার বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং বিশেষ গবেষণার জন্য বিশেষ বোনাসের বিধানও রাখা যেতে পারে। সার্বিকভাবে সংশোধনের লক্ষ্য যদি হয় শিক্ষা ও গবেষণার মান বৃদ্ধি এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর স্বার্থরক্ষা, তবে মনে হয় সম্মানিত শিক্ষকরাসহ কোনো পক্ষই এক্ষেত্রে আপত্তি করবে না। অধ্যাদেশের অপব্যাখ্যা দিয়ে অনেকেই বলে থাকেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশে তো নিয়মিত ক্লাস-পরীক্ষা নেয়ার কথা উল্লেখ নেই।’ এমন শিক্ষকও খুঁজে পাওয়া যায়, যিনি তাঁর বিভাগীয় পাঠদানের অংশ হিসেবে প্রতি বছর একটি মাত্র কোর্স নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক বছর পর শুরু করেন। একটি বিষয়ের পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন করতে প্রায় এক বছর সময় নিয়েছেন, এমন শিক্ষকও আছেন। কিন্তু অধ্যাদেশের দুর্বলতার কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়ারও সুযোগ থাকে না বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের।

উচ্চশিক্ষা প্রসারের মহান উদ্দেশ্য সামনে রেখে সরকার প্রতি বছর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দিচ্ছে। উন্নত বিশ্বে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে শিক্ষা ও গবেষণায় এগিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। বিপুল পরিমাণ টিউশন ফি দিয়ে প্রতি বছর আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড প্রভৃতি দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা পড়তে যাচ্ছে। আমাদের দেশেও এ সম্ভাবনাটা প্রবল। কেবল রাজধানীতে এসব বিশ্ববিদ্যালয় সীমিত না রেখে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে হবে। এতে উচ্চশিক্ষার সুযোগটা প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে যাবে। বর্তমানে জেলা পর্যায়েও কিছু বিশ্ববিদ্যালয় অবশ্য রয়েছে। কিন্তু যথাযথ তত্ত্বাবধানের অভাব, অতিমাত্রায় বাণিজ্যিক ভাবনার কারণে এ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের লক্ষ্য অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাহত হচ্ছে। এর পরিবর্তন আবশ্যক। সেক্ষেত্রে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নীতিমালা বা অধ্যাদেশেরও পরিবর্তন কাঙ্ক্ষিত।

মানসম্মত উচ্চশিক্ষা নিশ্চিতকরণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে সরকারের সমন্বয় করার জন্য ১৯৭৩ সালে বাঙালি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু উচ্চশিক্ষা দেখভালের দায়িত্বে থাকলেও কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না ইউজিসি। আইনি সীমাবদ্ধতা, রাজনৈতিক প্রভাব, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা প্রভৃতি কারণে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণের এখতিয়ার ইউজিসির হাতে নেই। বাস্তবায়নের ক্ষমতা না থাকায় প্রতিষ্ঠানটি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নানা ধরনের অনিয়মের ব্যাপারেও সেই অর্থে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠালেও অনেক সুপারিশ মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর ধরে পড়ে থাকে ফাইলবন্দি অবস্থায়। এছাড়া মন্ত্রণালয় সে সুপারিশ অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে পারে, না-ও পারে। মন্ত্রণালয় কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলে আদালতে মামলা হয়, আদালত স্থগিতাদেশ দেন। এভাবেই চলতে থাকে।

শিক্ষকদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা: পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একটি অংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেয়। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেয়ার বিধান থাকলেও অনেকেই এ নিয়ম মানে না। এমন শিক্ষকও আছেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেয়ার অনুমতি নিয়েছেন, কিন্তু ক্লাস নেন একাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। কোনো কোনো শিক্ষক জড়িত এসব বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা কাজেও। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল দায়িত্বের বাইরে এসব প্রতিষ্ঠানেই তাঁরা বেশি সময় দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এমন অবস্থায় আর্থিক সুবিধার কাছে নিজের প্রধান দায়িত্ব, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসটিই গৌণ হয়ে পড়ে। এমন শিক্ষকও আছেন, যাঁরা ইচ্ছা করেই বছরের একটি উল্লেখযোগ্য সময় বিভাগে ক্লাস নেয়া থেকে বিরত থাকেন। যথাযথ সময়ে পরীক্ষার খাতাও মূল্যায়ন করেন না। শিক্ষকদের এমন কর্মকাণ্ডে বিভাগে সেশনজটসহ একাডেমিক জটিলতা তৈরি হয়। অথচ এসব শিক্ষকই আবার প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে সময়ানুবর্তী ও যথেষ্ট দায়িত্বশীল। সেশনজটের কারণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক সেশন পিছিয়ে পড়ছে।

শিক্ষকদের অন্য আর্থিক কার্যাবলিতে জড়িত হওয়ার প্রবণতা রোধ করতে পারে শিক্ষকদের পর্যাপ্ত বেতনসহ আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করা। যদিও প্রতি বছর শিক্ষা খাতেই সর্বোচ্চ বিনিয়োগ করা হচ্ছে। তবে এ বিনিয়োগের যথাযথ ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন রয়ে যায়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় অনিয়ম, দুর্নীতি, আর্থিক অব্যবস্থাপনা একটি নিয়মিত চিত্র। এসব রোধ হলে সার্বিক পরিবেশ আরো উন্নত হবে। অস্বীকারের উপায় নেই, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতে সর্বোচ্চ বিনিয়োগের বিকল্প নেই। অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত জরুরি। দরকারি শিক্ষা-সংক্রান্ত উপকরণসহ সব প্রয়োজনীয়তা নিশ্চিত করা। দেশে উচ্চশিক্ষা খাতে সরকারি বরাদ্দ জাতীয় বাজেটের মাত্র দশমিক ৬৫ শতাংশ। এ বরাদ্দে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ন্যূনতম চাহিদা মেটানো সম্ভব হয় না। উন্নত বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা প্রজেক্ট বা কনসালট্যান্সিতে কাজ করেন। এক্ষেত্রে শিক্ষকের বাস্তবভিত্তিক প্রায়োগিক প্রযুক্তি ও সর্বশেষ তথ্যপ্রযুক্তি বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জ্ঞান লাভ করা যায়। ইংল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষকদের কনসালট্যান্সি বা বিভিন্ন প্রজেক্ট গ্রহণে উৎসাহিত করা হয়। তবে এক্ষেত্রে কনসালট্যান্সি বা প্রজেক্টে তিনি কত সময় ব্যয় করবেন, সে সময়ের ওপর ভিত্তি করে তার মূল বেতন থেকে কেটে নেয়া হয়। বিষয়টি এমন যে, মাসের বা বছরের ২০ শতাংশ সময় যদি কোনো শিক্ষক প্রজেক্ট বা কনসালট্যান্সিতে ব্যয় করেন, তবে এ সময়ের বেতন তার মূল বেতন থেকে কেটে নেয়া হবে। কেটে নেয়া অর্থ দিয়ে ঠিক ওই ২০ শতাংশ সময়ের জন্য আরেকজন শিক্ষককে নিয়োগ দেয়া হবে। ইংল্যান্ডে সাধারণত প্রজেক্টগুলো হয় লক্ষাধিক মিলিয়ন পাউন্ডের। প্রপোজাল সাবমিটের পর তা নিয়ে প্রতিযোগিতা হয়। বিভিন্ন শর্ত ও প্রপোজালের মান নিয়ে এ প্রতিযোগিতা হয়। এর মাধ্যমে কোনো বিভাগ প্রজেক্ট পেয়ে থাকে।

উচ্চশিক্ষাকে বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচাতে হলে মঞ্জুরী কমিশনকে এগিয়ে আসতে হবে। নিতে হবে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। বাঁচাতে হবে দেশের উচ্চশিক্ষাকে। সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য শিক্ষক, কর্মকর্তা নিয়োগ ও পদোন্নতির জন্য একটি সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। এছাড়া সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদানে কোনো ক্ষতি নেই। কিন্তু তা অবশ্যই হতে হবে নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষতি না করে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনকে এ ব্যাপারটিও দেখতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণা বাড়াতে হবে: আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতির পূর্বশর্ত হচ্ছে, উচ্চমানের গবেষণার অবকাঠামো তৈরি। এ কাঠামোয় প্রকাশিত গবেষণা জার্নালের মান নিয়েও প্রশ্ন থাকে। গবেষণার পিয়ার-রিভিউ প্রসেসে গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ধরন, গবেষকের রেপুটেশন, আগের পাবলিকেশন রেকর্ড প্রভৃতি বিষয় বিবেচনায় আনা হয়। বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই এ সূচকে শীর্ষে নেই। আন্তর্জাতিক তো পরের কথা, এ কারণে এশিয়ার সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায়ও বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নেই। বাংলাদেশে এখন লিবারেল আর্টসে ভালো কিছু পিএইচডি প্রোগ্রাম পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু বিজ্ঞান গবেষণার অবকাঠামোগত দুর্বলতার জন্য মেধাবী শিক্ষার্থীরা দেশে উচ্চশিক্ষায় উৎসাহিত হন না। ভালো মানের গবেষকও গবেষণায় কিংবা শিক্ষার্থীদের জ্ঞানদানে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনে (২০১০) প্রতি বছর গবেষণা খাতে ব্যয় করার বাধ্যবাধকতা আছে। আইনে সনদ পাওয়ার শর্তাবলিতে বলা আছে, সাময়িক অনুমতিপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সনদ পাওয়ার ক্ষেত্রে সাতটি শর্ত পূরণ করতে হবে। এর একটি হলো (৯ এর ৬ ধারা) বার্ষিক বাজেটের ব্যয় খাতে কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত একটি অংশ গবেষণার জন্য বরাদ্দ রেখে তা ব্যয় করতে হবে।

দেশে আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা খুব একটা চোখে পড়ে না। বিশ্বজনীনতার যুগে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন ও উন্নয়ন হচ্ছে। প্রতি বছর সফটওয়্যার নতুন ভার্সন পাচ্ছে, নতুন নতুন প্যাকেজ ও টুল বের হচ্ছে। এসবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সর্বশেষ আর্টিকেল, বই, রিপোর্ট সম্পর্কে অবগত না থাকলে আমাদের গবেষণার মান উন্নত হবে না। জ্ঞানচর্চা ও জ্ঞান-উৎপাদনের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় তখন আমাদের পরাজয় হবে অবশ্যম্ভাবী। আমাদের দুর্ভাগ্য, অনেক বিভাগের শিক্ষকই শিক্ষকতার শুরুর দিকেই কেবল বিভাগের নোটপত্র তৈরি করেন, অথবা তার ছাত্রকালীন নোটই ক্লাস নেয়ার জন্য ব্যবহার করেন। এভাবে চলতে থাকে বছরের পর বছর। ফলে তাঁর জ্ঞানের গভীরতা ও পরিধি যেমন বাড়ে না, তেমনি শিক্ষার্থীরাও বঞ্চিত হয় প্রাগ্রসর জ্ঞানের সংস্পর্শ থেকে।

এমন অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে, যেগুলো গবেষণা খাতে নিজেদের ব্যয় দেখিয়েছে। কিন্তু কোনো গবেষণা প্রকল্প ওই বছর পরিচালিত হয়নি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা মাস্টার্সে যে থিসিস করেন, তা এ খাতে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাগত কাঠামো এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন উন্নত দেশে গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোরই অবদান বেশি। বাংলাদেশে তার উল্টো। এখানকার অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নিয়েও প্রশ্ন আছে। সদিচ্ছার অভাব, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও পর্যবেক্ষণের অভাবে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার মান নিম্নমুখী।

সরকারকেও এক্ষেত্রে আন্তরিক সহযোগী হতে হবে। তবে উদ্যোগ গ্রহণ ও সমন্বয়টা করতে হবে ইউজিসিকেই। একজন ভালো গবেষককে গবেষণাকর্মে উৎসাহিত করতে হলে তাঁর জন্য চাই প্রণোদনা প্যাকেজ। সরকার শিক্ষা খাতে যে বরাদ্দ দেয়, তা আরো বাড়াতে হবে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো ফল অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের একটি অংশ নানা বঞ্চনার শিকার হয়ে দেশের বাইরে গেছেন, তাদের বড় এক অংশ নিজ নিজ ক্ষেত্রে অত্যন্ত কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখছেন। কখনো রাজনৈতিক কারণেও এদের নিয়োগ দেয়া হয়নি। এ সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। শিক্ষার মান নিশ্চিতকরণ ও সুষ্ঠু পরিবেশের জন্য যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ, গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে জোর দেয়া প্রয়োজন। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে ভূমিকাটা নিতে হবে ইউজিসিকেই।

ঝরে পড়া রোধে করণীয়: আমাদের গ্রামীণ সমাজের অনেক পরিবার এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। রয়েছে অতি দারিদ্র্যের সংখ্যাও। অনেক অভিভাবক সন্তানের লেখাপড়ার পেছনে অর্থ ব্যয় করতে পারেন না। অথবা তাদের ইচ্ছারও ঘাটতি রয়েছে। প্রাথমিক স্তরে হয়তো শিক্ষার্থীরা বিনা মূল্যে বই পাচ্ছে। কিন্তু পড়াশোনার অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচের জোগান দেয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও হয়তো বিদ্যালয়ে খাবারও দেয়া হচ্ছে। কিন্তু আবার প্রাথমিক স্তরেই শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়ানো বাধ্যতামূলকও করা হচ্ছে। স্কুলগুলোয় টিউশন ও কোচিং প্রথা মারাত্মকভাবে বেড়েছে। কিন্তু দরিদ্র মানুষের পক্ষে টাকা দিয়ে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার গ্যাপ কোচিংয়ে পূরণ সম্ভব হচ্ছে না। শিক্ষা উপকরণ থেকে শুরু করে প্রাইভেট কোচিং, গাইড বই সবকিছু মিলিয়ে শিক্ষা এখন বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। অনেকের পক্ষেই এ ব্যয় বহন করা সম্ভব হচ্ছে না। লেখাপড়া দিয়ে বেকারত্ব দূর হবে— এমনটিও নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ফলে অনেক শিক্ষার্থী লেখাপড়া ছেড়ে দিচ্ছে। আমাদের দেশে অনেক শিশুশ্রমিক আছে। গ্রামগঞ্জে পরিবারের সদস্যরা নিজেদের প্রয়োজনেই সন্তানদের লেখাপড়া বাদ দিয়ে কাজে লাগায়। যাদের পরিবার কৃষিকাজ করছে, তারা ওই ধরনের কাজে চলে যায়; যার জন্য ঝরে যায়।

আরেকটি বিষয় উল্লেখ করার মতো, মাধ্যমিকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ মেয়ে। যারা বাল্যবিবাহ ও সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে শিক্ষা চালিয়ে নিতে পারছে না। অভাবের সংসার চালানো, আবার মেয়ের পেছনে বাড়তি খরচ। সেক্ষেত্রে মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিলে সব ঝামেলা চুকে গেল। আর ছেলেরা যোগ দিচ্ছে কাজে। কারণ পড়ালেখার চেয়ে কাজের মাধ্যমে আয় করাই পরিবারের কাছে লাভজনক বলে মনে হচ্ছে। বিশেষ করে চরাঞ্চল, হাওড় ও পাহাড় এলাকার চিত্র খুবই উদ্বেগজনক। দুর্গম এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দূরত্ব বেশি হওয়ায় অনেকেই লেখাপড়া বাদ দিয়ে কাজে যোগ দিচ্ছে।

আবার রয়েছে পড়াশোনার পদ্ধতিগত জটিলতাও। একটি ভালো উদ্যোগ সৃজনশীল পদ্ধতি। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থীরা, এমনকি শিক্ষকরাও অনেক ক্ষেত্রে এটার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারেননি। শিক্ষার্থীরা পিএসসিতে যেভাবে পাস করে, পরবর্তীতে মাধ্যমিক স্তরে ভর্তি হয়ে নতুন কারিকুলামের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। প্রাথমিকে পাঁচটি বই পড়া একজন শিক্ষার্থীকে ষষ্ঠ শ্রেণীতে উঠেই ১৩-১৪টি বই পড়তে হচ্ছে। অনেকেই এ বইয়ের চাপ নিতে পারছে না। প্রাথমিকের জন্য প্রতি গ্রামে স্কুল আছে। মাধ্যমিকে তা নেই। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলে পঞ্চম শ্রেণী পাসের পর ছাত্রীরা আর দূরের স্কুলে পড়তে যায় না। অভিভাবক, শিক্ষক বা সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে শিক্ষার প্রসার, সবার শিক্ষা নিশ্চিতকরণে ভূমিকা রয়েছে। সরকারিভাবে বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়ন: দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণার সুষ্ঠু অবকাঠামো নেই বললেই চলে। প্রথম সারির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয়ও উন্নতমানের গবেষণাগার ও মানসম্মত গবেষণাপত্রের খুবই অভাব। যোগ্য মানবসম্পদ সৃষ্টি, শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমের গতিবৃদ্ধি ও মানোন্নয়ন এবং সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির জন্য প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি করে সেন্টার অব একসিলেন্স প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। কেবল প্রতিষ্ঠা করলেই চলবে না, সেগুলোকে কার্যক্ষম করতে হবে। গবেষক-শিক্ষককে আন্তরিকতার সঙ্গে গবেষণায় মনোনিবেশ করতে হবে। গবেষণায় সময় দিতে হবে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও গবেষণার ন্যূনতম মান বাধ্যতামূলক করতে হবে। গবেষণা পরিচালনার লক্ষ্যে সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বরাদ্দ রাখতে হবে। গবেষণাবিষয়ক প্রকাশনা ও সাময়িকীও বের করতে উদ্যোগ নিতে হবে। কেবল পদোন্নতি নয়, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর নিয়মিত গবেষণা লেখালেখিই বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত এগিয়ে রাখতে পারে। মানসম্মত শিক্ষা-গবেষণা নিশ্চিতকরণে আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয়ও এ রকম কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকা জরুরি। দেখভালের প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের তত্পরতা বাড়াতে হবে।

জাতীয় উন্নয়ন ও শিক্ষা ব্যবস্থা: বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণত ভর্তি পরীক্ষার মধ্য দিয়েই সেশনজট শুরু হয়। এইচএসসি পরীক্ষা ও এর ফল প্রকাশে লেগে যায় জুলাই-আগস্ট। এর পর একেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা হয় একেক সময়ে। সব থেকে আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়, তাও অক্টোবরে। এর পর ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ক্লাস শেষ করতে লেগে যায় আরো দু-এক মাস। জুলাই থেকে সেশনের হিসাব করা হয় আমাদের দেশে। এ হিসাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষার্থীরা ক্লাস শুরু করে বছরের পাঁচ-ছয় মাস পর। আর অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা শেষ হতে আরো কয়েক মাস সময় লেগে যায়। এক্ষেত্রে আমাদের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার সময়সূচিতেই পরিবর্তন আনতে হবে। উদ্যোগ নিলে বছরের শুরুতেই এসএসসি, মার্চ বা এপ্রিলে এইচএসসি পরীক্ষার আয়োজন করা যেতে পারে। জুনের মধ্যে সব ভর্তি পরীক্ষা শেষ করে জুলাই থেকে ক্লাস শুরুর একটি কার্যকরী পরিকল্পনা নিলে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ভর্তি পরীক্ষার ক্ষেত্রে সমন্বিত পদ্ধতির প্রবর্তন করা যেতে পারে। এতে বহুদিক থেকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে।

ডিজিটাল ল্যাবে প্রশিক্ষণ: ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রথম জাতীয় অঙ্গীকার হচ্ছে ডিজিটাল টুলস ব্যবহার করে দেশ থেকে দারিদ্র্য ও বৈষম্য দূর করা এবং জনগণের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ ন্যূনতম মৌলিক চাহিদা পূরণ করা। শিক্ষা পদ্ধতিতে ডিজিটাল পদ্ধতি প্রবর্তনের মাধ্যমে যুগোপযোগী দক্ষ জনবল তৈরির উদ্যোগটির যথাযথ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া তদারকি করতে হবে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে স্থাপিত শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাবে ঠিকমতো কম্পিউটার চর্চা হচ্ছে কিনা, তা থেকে শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ছে কিনা, তা খুঁজে দেখা জরুরি।

মানসম্পন্ন শিক্ষার বিস্তার: বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে শিক্ষকের গুরুত্ব সর্বাধিক। একজন শিক্ষক একটি জাতি গঠনের দায়িত্বে নিয়োজিত। অথচ কিছু শিক্ষকদের ধ্যান-ধারণা, সামাজিক বিবেচনা, প্রশাসনিক মূল্যায়ন সব মিলিয়ে শিক্ষকের অবস্থান কেবল একটি ‘চাকরি’তে পরিণত হয়েছে। মৌলিক দায়িত্ব থেকে শিক্ষক সমাজ বিচ্যুত। শিক্ষাদানের মহান যে ব্রত, তা আজ প্রাথমিক পর্যায় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত, সর্বস্তরের শিক্ষক সমাজের মাঝে অনুপস্থিত। সারা দেশের গ্রামগঞ্জে, শহরে-নগরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কিন্ডারগার্টেন। প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে নিত্যনতুন আরো প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু করে নানাধর্মী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সেবার পরিবর্তে বাণিজ্যিক লক্ষ্যে পরিচালিত হচ্ছে বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান।

সর্বক্ষেত্রে গুণগত শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে হলে প্রাথমিক পর্যায়কে গুরুত্ব দিতে হবে সর্বাগ্রে। এ লক্ষ্যে দরকার সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষকতায় আসা। সেটা প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষকতা। এক্ষেত্রে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধার ব্যাপারে আপত্তি আছে। শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকদের বেতন-কাঠামো আকর্ষণীয় ও সন্তোষজনক, নিয়োগ-প্রক্রিয়া সুষ্ঠু এবং শিক্ষক-প্রশিক্ষণের বর্তমান ধারার সংস্কার করা জরুরি।

চলমান পদ্ধতিতে প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে যে ধরনের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়ে থাকে, তার আরো আধুনিকায়ন করা অত্যাবশ্যক। বর্তমানে শিক্ষা ব্যবস্থা প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে। শিক্ষকদের প্রযুক্তিবান্ধব হওয়া উচিত। ডিজিটাল বাংলাদেশের কার্যক্রম প্রাথমিক অবস্থা থেকেই শুরু হবে। শিক্ষার নীতিনির্ধারকদের প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার শতভাগ মান নিশ্চিত করার জন্য গুরুত্ব দিতে হবে। এ লক্ষ্যে প্রাথমিক শিক্ষাকে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। পিছিয়ে থাকা জনপদ ও এলাকাভিত্তিক পরিকল্পনা করে কাজের পদক্ষেপ নিতে হবে। বিদ্যালয় পরিচালনায় দায়সারা গোছের কমিটি নয়, সমাজের সক্রিয় ব্যক্তিদের বিদ্যালয় পরিচালনায় সম্পৃক্ত করতে হবে। নিয়মিত তদারকি ও সভার মাধ্যমে প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে গতিশীল করে তুলতে হবে। বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি, অভিভাবক কমিটি, ইউনিয়ন পরিষদের স্থায়ী কমিটি ও উপজেলা শিক্ষা অফিসের মধ্যে সমন্বয় করতে হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে প্রধানমন্ত্রীর অধীনে নিয়ে এসে বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার উন্নয়নে একজন করে উপদেষ্টা নিয়োগ করে তাদের মাধ্যমে লক্ষ্য বাস্তবায়নে একটি নির্দিষ্ট সময় (স্বল্পমেয়াদি) নির্ধারণ করে দেয়া যেতে পারে।

ত্রুটিমুক্ত পাঠ্যবই: প্রতি বছরই প্রশ্ন ওঠে আমাদের বিনা মূল্যে শিক্ষার্থীদের বিতরণ করা বইয়ের মান নিয়ে। গেল বছরের বই নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, প্রাথমিক পর্যায়ের পাঠ্যবইয়ে ছাপা বর্ণগুলো ছোট ও হিজিবিজি। লেখা এবং ছবিও অস্পষ্ট। এগুলো পড়তে শিশুদের কষ্ট হয়। বইয়ের ভেতরে গল্প ও লেখার সঙ্গে মিল নেই ছবির। কোথাও একই ছবি দুবার ছাপা হয়েছে। পৃষ্ঠাসজ্জাও ঠিক নেই। কিছু বইয়ে রয়েছে গল্প ও ছবিবিহীন কেবল সাদা পাতা। আবার কোনো কোনো বইয়ের ভেতরের কিছু পাতাও নেই। কাগজ খুবই পাতলা। সামান্য পানি লাগলেই বইয়ের পাতা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বই বাঁধাইয়ে ব্যবহার করা হয়েছে নিম্নমানের আঠা। বাঁধাইয়ের মানও ভালো নয়। বই বিতরণের পর পরই বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অভিভাবকরা বইয়ের মান নিয়ে নানা অভিযোগ নিয়ে আসেন। অনুসন্ধানে তাদের অভিযোগের সত্যতাও পাওয়া গেছে। কোথাও সীমিত পরিসরে কাটাছেঁড়া বা ভুল ছাপার বই পরিবর্তন করে নতুন বই দেয়া হয়েছে। শত ভুল রেখেই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়ার কথা বারবারই উচ্চারিত হয়। শিশুদের মনোযোগী আর শিক্ষা অর্জনে আগ্রহী করে তুলতে পারে আকর্ষক বই। তবে আমাদের বইয়ের বাস্তবতা যদি এমন হয়, তবে ভবিষ্যতে ভয়াবহ সংকট সৃষ্টি হবে।

প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন: বাস্তবিকভাবেই গুণগত ও মানসম্মত শিক্ষা এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। জাতীয় উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন ও গতিশীল সমাজ গঠনে গুণগত শিক্ষা চালকের ভূমিকা নিতে পারে। গুণগত ধারার এ শিক্ষার শুরু হতে হবে প্রাথমিক অবস্থা থেকেই। শিশুদের কচি মনে প্রকৃত শিক্ষার বীজটা বপন করে দিতে হবে। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হলো শিক্ষার প্রারম্ভিক পর্যায়। প্রাথমিক শিক্ষাই হচ্ছে সব শিক্ষার মূল ভিত্তি।

ভৌত অবকাঠামোগত সুবিধাদির পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দক্ষ ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক। এর মাধ্যমে শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন, সংরক্ষণ ও প্রসার সম্ভব। একটি স্বনির্ভর জাতিগঠনের পূর্বশর্ত যোগ্য নাগরিক গড়ে তোলা। আজকের কচিপ্রাণ আগামী দিনের নেতা। কচিকাঁচার এ দলকে যথোপযুক্ত ও যোগ্য করে গড়ে তোলার দায়িত্ব আমাদেরই। এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্র ও এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক। প্রকৃত ব্যাপার হলো, শিক্ষকের এসব গুণাবলির অভাবে বা দক্ষ শিক্ষকের অভাবে শিক্ষার মানোন্নয়নে গৃহীত কোনো পদক্ষেপই কাজে আসছে না। শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকদের বেতন-কাঠামো আকর্ষণীয় ও সন্তোষজনক করা, নিয়োগ-প্রক্রিয়া সুষ্ঠু করা এবং শিক্ষক-প্রশিক্ষণের বর্তমান ধারার সংস্কার করা জরুরি। আশার কথা হলো, সরকার এক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। এ উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে হবে।

প্রাথমিকে সমাপনী পরীক্ষা ভীতি: প্রাথমিকে সমাপনী পরীক্ষা নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। একটি পক্ষ এ পদ্ধতির পুরো বিরোধিতা করে। অন্যপক্ষ এর সুবিধাগত দিকের কথা বিবেচনা করে এ পদ্ধতি চালু রাখার পক্ষেই মত দেয়। পরীক্ষাকে শিশুদের জন্য দানব হিসেবে আখ্যায়িত করে কেউ কেউ। বিভিন্ন ক্লাসে ‘ফেল’ করায় অনেক শিশু প্রাথমিক পর্যায়েই ঝরে পড়ে। অনেক শিশু পরীক্ষার ভয়ে স্কুলেই যেতে চায় না। অন্যদিকে এসব পরীক্ষার জন্য অভিভাবকরা শিশুদের এত বেশি চাপে রাখে যে, তাদের পক্ষে সৃজনশীলতার চর্চা করা সম্ভব হয়ে ওঠে না বলে যুক্তি তাদের। এ পরীক্ষা নিয়ে ভাবতে হবে।

স্কুল পর্যায়ে বিজ্ঞানচর্চা: বর্তমানে সরকারের নানা প্রকল্পের মাধ্যমে মফস্বল বা প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও কম্পিউটার, প্রজেক্টরসহ ডিজিটালাইজেশনের নানা উপকরণ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু বিজ্ঞান শিক্ষার উন্নতিতে দৃশ্যমান পদক্ষেপ আশা জাগাতে পারছে না। বিজ্ঞানে দক্ষ শিক্ষক, শিক্ষা উপকরণ ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোসহ নানা কারণে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে বিজ্ঞান শিক্ষা ব্যবস্থা প্রায় মুখ থুবড়ে পড়েছে। বিজ্ঞান শিক্ষায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে শিক্ষার্থীরা। দিন দিন কমে যাচ্ছে এ বিভাগের ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা। শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতা ও অবহেলার কারণে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বিজ্ঞান শিক্ষা। আগ্রহ থাকলেও যোগ্য শিক্ষক ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা না থাকায় ছাত্রছাত্রীরা বিজ্ঞান শিক্ষায় এগিয়ে আসছে না। বিজ্ঞানভীতি দূর করতে শিক্ষকদের পক্ষ থেকেও কোনো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। দেশের বেশির ভাগ স্কুল ও কলেজে বিজ্ঞান শিক্ষার বেহাল ও করুণ চিত্র। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নামমাত্র যে বিজ্ঞানাগার আছে, তাতে নেই কোনো বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি। আবার যেসব প্রতিষ্ঠানে সামান্য কিছু যন্ত্রপাতি ছিল, তাও রক্ষণাবেক্ষণের দুর্বলতার কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ছাত্রছাত্রীদের অভিযোগ, কোনো শ্রেণীতেই বিজ্ঞানের কোনো বিষয়ে হাতে-কলমে (প্র্যাকটিক্যাল) শিক্ষা দেয়া হয় না। সারা বছর তালাবদ্ধ থাকে গবেষণাগার। এছাড়া বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষকরাও শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান নিয়ে পড়তে তেমন উৎসাহ দেন না। তাঁরা নিজেরাই অনেক সময় শিক্ষার্থীদের মনে বিজ্ঞান ও গণিতভীতি ছড়িয়ে দিচ্ছেন। শিক্ষকরা পিছিয়ে থাকলে ছাত্রছাত্রীরা এগিয়ে আসবে কীভাবে? ফলে দিন দিন বিজ্ঞান শিক্ষায় ছাত্রছাত্রী কমে যাওয়ার পাশাপাশি নাজুক অবস্থা বিরাজ করছে।

বিজ্ঞান শিক্ষা জনপ্রিয় করতে হলে বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হবে। বিষয়ভিত্তিক বিজ্ঞানমনস্ক ভালো শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। সেকেন্ডারি লেভেলে বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের চিন্তাচেতনা ও কর্মপরিকল্পনার ওপর নির্ভর করে অনেক কিছু। আধুনিক বিশ্ব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিশ্ব। এ বিশ্বে তাল মিলিয়ে চলতে হলে আমাদের বিজ্ঞান ও গণিতে দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে হবে। তত্ত্বীয় শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবহারিক ক্লাসটি করা হলে শিক্ষার্থীদের আতঙ্ক অনেকাংশেই কেটে যেত। তবে বিজ্ঞান শিক্ষার এ দুর্দশা একদিনে সৃষ্টি হয়নি। এটি ধারাবাহিক একটি নেতিবাচক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আজকের সংকটজনক অবস্থায় পৌঁছেছে। শিক্ষার প্রাথমিক পর্যায় থেকে শুরু করে উচ্চস্তর পর্যন্ত বিজ্ঞান শিক্ষার বইয়ের সংকট রয়েছে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিকে পর্যাপ্ত ও মানসম্মত বই নেই। কয়েকজন লেখকের বই-ই ঘুরে ফিরে ছাত্রছাত্রীদের পড়তে হচ্ছে। শিশুদের বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে লোভনীয় ও আকর্ষণীয় অনেক বই উন্নত দেশে রয়েছে। আমাদের বই সংকটের বিষয়টি গুরুতর। অতি শিগগিরই এর সমাধান করা সম্ভব না হলে সরকার গৃহীত ও প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত সব উন্নয়ন কর্মসূচি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।

লেখক: সাবেক সদস্য, পাবলিক সার্ভিস কমিশন

সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

কমেন্ট করুন

...

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top