logo
logo
news image

পলান সরকার আর বই বিলি করবেন না

পলান সরকারের জন্ম ১৯২১ সালে। তাঁর আসল নাম হারেজ উদ্দিন। তবে পলান সরকার নামেই তাঁকে চেনে দশ গ্রামের মানুষ। জন্মের মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় তাঁর বাবা মারা যান ফলে মাত্র ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পড়ে শিক্ষাজীবনের ইতি টানতে হয় তাকে। তবে বইয়ের প্রতি তার প্রেম ছিলো আজীবন ফলে প্রতিষ্ঠানিক পড়া ঐখানে শেষ হলেও জ্ঞান অর্জনের পড়া, জানার আগ্রহের পড়া শেষ হয়নি পড়ে গেছেন যত বই পেয়েছেন জীবন ভর। শুধু নিজেই পড়েন নি; পড়ার আনন্দ, জ্ঞানের আনন্দ সবার মাঝে দিতে চেয়েছেন কল্যানকামী সহজ সরল এই মানুষটি । রাজশাহীর বাঘা উপজেলার বাউসা গ্রামের বই পড়া

আন্দোলনের ভিত তৈরি করেন তিনি। স্থানীয় একটি উচ্চবিদ্যালয়ের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি ছিলেন পলান সরকার। এলাকার মানুষকে বিনা পয়সায় বই পড়ার ব্যবস্থা করেন তিনি। তবে শর্ত ছিলো পড়া শেষে বই ফেরত দিতে হবে। গ্রামে গ্রামে ঘুরে ছোট-বড় সবার দোরগোড়ায় বই হাতে পৌঁছে যেতেন পলান সরকার। পলান সরকার ১০-১২টি গ্রামের কিশোর,যুবক, বৃদ্ধ মিলে হাজারো গ্রামের মানুষকে তিনি বই পড়াতে অভ্যস্ত করেছেন । পবিত্র কোরআনের প্রথম কথা ‘পড়’ এবং ইসলাম ধর্মের জ্ঞান অর্জন ফরজ । তিনি সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মানুষকে পড়তে এবং জ্ঞান অর্জন করতে আগ্রহী করে তুলেছেন । কোন প্রচার চাননি , চাননি কোন স্মীকৃতি । হেঁটে হেঁটে মাইলের পর মাইল গ্রমের মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে বই হাতে পৌছে দিয়েছেন । অসাধারণ এক মানুষ । সেই পলান সরকার আর বই বিলি করবেন না। গতকাল শুক্রবার দুপুরে ৯৮ বছর বয়সে নিজ বাড়িতে তিনি মারা যান,(ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন)। বার্ধক্যজনিত কারণে অসুস্থ ছিলেন পলান সরকার।

গ্রামের তরুণ-তরুণী সবার কাছেই তিনি ‘বইওয়ালা দুলাভাই’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন । সেই বইওয়ালা দুলাভাই গতকাল সবাইক ছেড়ে চলে গেছেন । নিজের প্রতিষ্ঠানিক লেখাপড়া হয়নি, কিন্তু পলান সরকার তাঁর ছেলেদের সবাইকে শিক্ষিত করে গড়ে তুলেছেন। তাঁর চার ছেলে শিক্ষকতা করছেন। কেউ কলেজে আর কেউ স্কুলে। আরেক ছেলে লেখাপড়া শেষ করে বাড়িতে থাকেন। বাবার চালকলের ব্যবসা দেখেন। আর সবার ছোটজন একটেল কোম্পানির প্রকৌশলী। তাঁর তিন মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়ে বিয়ে দিয়েছেন। গত বছরের ২১ ডিসেম্বর পলান সরকারের স্ত্রী রাহেলা বেগম (৮৫) মারা যান। তার বাংলায় মাস্টারর্স

পড়া কন্যা বলেন,
একবার অতিবর্ষণে জমিতে ধান হলো না। চাল কিনে খেতে হবে। একদিন বাবা বাজারে গিয়ে ব্যাগ ভরে চাল নিয়েছেন। তারপর পকেটে হাত দিয়ে দেখেন, টাকা নেই। চুরি হয়ে গেছে। বাবা ব্যাগ উপুড় করে চাল ঢেলে দিয়ে ফিরে আসছিলেন। দোকানি ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘সরকার সাহেব, আপনি চাল ফেরত দিয়ে যাচ্ছেন কেন?’ বাবা বললেন, পকেটমার টাকা নিয়ে নিয়েছে। দোকানি বললেন, ‘আপনি পরের হাটে এসে টাকা দিয়েন।’ বাবা বললেন, পরের হাটে যদি আর আসতে না পারি? বাবা চাল না নিয়েই ফিরে আসেন।
আমাদের একজন আত্মীয় দূর থেকে আমাদের পুকুরে গোসল করতে আসতেন। বাবা বলতেন, বাড়ির পাশে পুকুর কাটলেই হয়, এত দূরে কষ্ট করে আসার কী দরকার? আমাদের সেই আত্মীয় বাবাকে বললেন, ‘আমার বাড়ির কাছে আপনার দুই বিঘা জমি আছে, রেজিস্ট্রি করে দিলেই পুকুর কাটতে পারি।’ এ কথা শুনে সত্যি সত্যিই বাবা তাঁকে দুই বিঘা জমি রেজিস্ট্রি করে দেন। যদিও জমির বিনিময়ে কিছু টাকা তিনি দিয়েছেন, কিন্তু জমিটা তো আমাদের বিক্রি করার কোনো প্রয়োজন ছিল না। বাবা হাসতে হাসতে এ রকম অনেক বড় বড় কাজ করে ফেলতেন।" - এই অসাধারণ মানুষটির কথা প্রথম প্রচার করেন ইত্যাদি অনুষ্ঠানে হানিফ সঙ্কেত । তথনই মানুষ এই অসাধারণ ব্যক্তিটিকে খুঁজে পান । সবার মন শ্রদ্ধায় ভরে উঠে । চিনে ফেলেন সবাই এই সাদা মনের মানুষটিকে । ২০১১ সালে সামাজসেবায় অবদানের জন্য রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মান একুশে পদকে ভূষিত হন পলান সরকার ।
বিনামূল্যে বই বিতরণ করে সকলের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ সৃষ্টির করার জন্য পলান সরকার ‘সাদা মনের মানুষ’ খেতাবেও ভূষিত হন। প্রথম আলোতে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন , "জানি না আর কত দিন হাঁটতে পারব। যেদিন আমার পথচলা থেমে যাবে, সেদিন এই প্রতিষ্ঠিত পাঠাগার আমার পক্ষে আন্দোলন করে যাবে "। অনেক শ্রদ্ধা তার প্রতি । দয়াময় আল্লাহ পালান সরকারকে জান্নাতুল ফেরদৌস প্রদান করুন ।
মো.আলমাসুর রহমান
প্রশিক্ষক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
০২/০৩/১৯

কমেন্ট করুন

...

সাম্প্রতিক মন্তব্য

Top